ভূমিকা
র্যাব্বিনিক জুডাইজম (Rabbinic Judaism) হলো আধুনিক ইহুদিবাদের মূলধারা, যা ইহুদি ধর্মের ইতিহাসে সবচেয়ে স্থায়ী ও প্রভাবশালী রূপ।
খ্রিষ্টাব্দ প্রথম শতকে জেরুজালেমের দ্বিতীয় মন্দির ধ্বংসের পর যখন পুরনো পুরোহিততন্ত্র ভেঙে পড়ে, তখনই উদ্ভব হয় এই নতুন ধারা—যেখানে ধর্মচর্চা পরিচালিত হয় পুরোহিতের বদলে র্যাব্বি (Rabbi) বা ধর্মগুরুর ব্যাখ্যা ও শিক্ষার মাধ্যমে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
খ্রিষ্টাব্দ ৭০ সালে রোমানরা জেরুজালেম দখল করে এবং দ্বিতীয় মন্দির সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়।
এই ঘটনার পর ইহুদিবাদের কেন্দ্রীয় উপাসনা ব্যবস্থা—বলিদান, মন্দিরপূজা, পুরোহিত শ্রেণি—সবকিছু বিলুপ্ত হয়ে যায়।
তখনই কিছু পণ্ডিত ও ধর্মবিশারদ এক নতুন ধর্মীয় কাঠামো তৈরি করেন, যার কেন্দ্র ছিল তোরাহর (Torah) ব্যাখ্যা, অধ্যয়ন ও নৈতিক জীবনযাপন।
এই ব্যাখ্যাভিত্তিক ধারা-ই পরবর্তীতে র্যাব্বিনিক জুডাইজম নামে পরিচিত হয়।
মূল বিশ্বাস ও বৈশিষ্ট্য
র্যাব্বিনিক জুডাইজমের মূল ধারণা হলো—
- ঈশ্বরের সঙ্গে ইসরায়েলের চুক্তি (Covenant) চিরস্থায়ী; মন্দির ধ্বংস হলেও সেই সম্পর্ক অটুট।
- তোরাহ (লিখিত আইন) ও তালমুদ (মৌখিক আইন ও ব্যাখ্যা) – উভয়ই ঈশ্বরপ্রদত্ত ও ধর্মীয় কর্তৃত্বপূর্ণ।
- র্যাব্বি বা ধর্মশিক্ষকরা তোরাহর অর্থ ব্যাখ্যা করে সমাজে প্রয়োগ করেন।
- ধর্মচর্চা নির্ভর করে আইন (Halakha), নৈতিকতা, প্রার্থনা ও অধ্যয়নের ওপর, মন্দিরের আনুষ্ঠানিক বলিদানের ওপর নয়।
মৌখিক আইন ও তালমুদের গুরুত্ব
র্যাব্বিনিক ঐতিহ্যে মৌখিক শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই শিক্ষাগুলো পরবর্তীতে সংকলিত হয় দুইটি প্রধান গ্রন্থে—
- মিশনা (Mishnah) – মৌখিক আইনের প্রথম সংকলন (খ্রিষ্টাব্দ ২০০ নাগাদ)।
- তালমুদ (Talmud) – মিশনার উপর র্যাব্বিদের বিশদ আলোচনা ও ব্যাখ্যা।
তালমুদের দুইটি সংস্করণ আছে—- বাবিলনীয় তালমুদ (Babylonian Talmud)
- জেরুজালেম তালমুদ (Jerusalem Talmud)
এই দুইটি গ্রন্থই র্যাব্বিনিক জুডাইজমের ধর্মীয় জীবনের ভিত্তি।
উপাসনা ও সামাজিক জীবন
- মন্দিরের পরিবর্তে সিনাগগ (Synagogue) বা উপাসনালয় হলো ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র।
- প্রতি ইহুদি পুরুষের জন্য দৈনিক প্রার্থনা বাধ্যতামূলক ধরা হয়।
- শবাথ (Sabbath), কোশের খাদ্যনীতি, পারিবারিক আইন ও উৎসবগুলো কঠোরভাবে পালন করা হয়।
- শিক্ষা ও বিতর্ককে (Debate) ধর্মীয় অনুশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়।
প্রভাব ও বর্তমান অবস্থান
আজকের বিশ্বের অধিকাংশ ইহুদি সম্প্রদায়—Orthodox, Conservative, ও Reform Judaism—সবই মূলত র্যাব্বিনিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
এই ধারাই ইহুদিবাদকে সময়ের সাথে টিকিয়ে রেখেছে, মন্দির হারিয়ে ফেলার পরও ধর্মকে জীবন্ত ও প্রাসঙ্গিক রেখেছে।
র্যাব্বিনিক জুডাইজম ইহুদি ধর্মকে কেবল আচার নয়, বরং এক নৈতিক ও জ্ঞানভিত্তিক সভ্যতার রূপ দিয়েছে।
উপসংহার
র্যাব্বিনিক জুডাইজম ইহুদিবাদের সেই ধারা যা ধ্বংসাবশেষ থেকে নতুন জীবন এনে দিয়েছিল।
যেখানে একসময় বলিদান ও পুরোহিত ছিল কেন্দ্রে, সেখানে এখন স্থান নিয়েছে শিক্ষা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ।
এই রূপান্তর শুধু ইহুদিবাদ নয়, সমগ্র মানবসভ্যতার ধর্মীয় চিন্তায় এক গভীর ছাপ রেখে গেছে।








Leave a Reply